March 2023

Tuesday, March 7, 2023

বসন্তের যত রোগ





 

প্রকৃতি বসন্ত যেভাবে গ্রহণ করে, মানুষের শরীর সেভাবে পারে না। এ সময় দিনে গরম আবার রাতে ঠান্ডা—এমন আবহাওয়ায় শরীর খারাপ হতে পারে কারও কারও।

বসন্তকালে শারীরিক নানা জটিলতার কিছু অনুঘটকও রয়েছে। এ সময় বাতাসে ধূলিকণা, ফুলের রেণু, পাতা ওড়া বেড়ে যায়। বসন্তে ফুলের একটি বড় অংশের পরাগায়ন ঘটে বাতাসের মাধ্যমে। তাই বসন্তে পুষ্পরেণু অ্যালার্জি সাধারণ ঘটনা। শুষ্ক হাওয়ায় ধুলাবালু থেকেও অ্যালার্জির সমস্যা হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ চুলকানো ও চোখ লাল হয়ে যাওয়া। তাই যাঁদের একটু অতি সংবেদনশীলতা বা অ্যালার্জির প্রবণতা আছে, তাঁদের এই সময়টা থাকতে হবে সাবধান। অ্যালার্জিজনিত এসব সমস্যা এড়াতে মুখে মাস্ক বা রুমাল ব্যবহার করতে পারেন।

বসন্তকালের কাশি বেশির ভাগ সময় দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আপনা–আপনি সেরে যায়। উপসর্গ থেকে আরাম পাওয়ার জন্য কাশির সিরাপ নয়; বরং কিছু উপদেশ মেনে চলতে পারেন।


 

প্রতিরোধ

  • প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। এতে কফ পাতলা হবে।

  • গরম পানির ভাপ নিতে পারেন। এতেও কফ পাতলা হবে, তবে মনে রাখবেন, ভাপে করোনাভাইরাসসহ অন্যান্য ভাইরাস মারা
    যায় না।

  • শুকনা কাশিতে গলা খুসখুস করলে হালকা গরম পানিতে একটু লবণ দিয়ে কুলকুচি বা গার্গল করুন। মুখে কোনো লজেন্স, লবঙ্গ বা আদা রাখলেও আরাম পাবেন।

     


     

করণীয়

ঘর থেকে বের হওয়ার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে নিন। যদি রাতের দিকে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে সঙ্গে একটা গরম কাপড় রাখুন। আবার একগাদা শীতের কাপড় পরার কারণে ঘেমে গিয়ে ঘাম বসে শরীর খারাপ হতে পারে। শীত বিবেচনায় রেখে কাপড়, কাঁথা ব্যবহার করুন। বাড়িতে বা অফিসে কেউ ভাইরাস জ্বর বা সর্দি-কাশিতে ভুগলে সতর্ক থাকুন। কারণ, এগুলো সংক্রামক রোগ। তাই সম্ভব হলে একটু দূরত্ব বজায় রাখুন।

  • কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, রক্ত দেখতে পেলে, কাশতে কাশতে যখন শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে বা প্রচণ্ড জ্বর থাকছে, কথা বলতে কষ্ট হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যেকোনো কাশি দুই বা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকলে অবশ্যই বক্ষব্যাধিবিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন।

  • বসন্তে ফুলের রেণু ও ধুলাবালু থেকে অনেকের হাঁপানি বেড়ে যেতে পারে। শ্বাসটান বাড়লে চিকিৎসকের পরামর্শে ইনহেলার নিতে হবে। 

     

    সূত্র: অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান, মেডিসিন ও বক্ষব্যাধিবিশেষজ্ঞ

নারীর হরমোনজনিত সমস্যা


 


পুরুষের চেয়ে নারীর হরমোনজনিত সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। বয়সভেদে নারীর বিভিন্ন হরমোনজনিত সমস্যা হতে দেখা যায়। যেমন শৈশব-কৈশোরে থাইরয়েড বা স্টেরয়েড বা গ্রোথ হরমোনের অসামঞ্জস্যের কারণে অনেকে খর্বকায় হয়, স্থূলকায় হয়ে পরে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে সমস্যা হয়।

ইস্ট্রোজেন-প্রোজেস্টেরন হরমোনের তারতম্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তনগুলো বয়সের আগেই চলে আসে অথবা দেরিতে আসে। কৈশোরের সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা পলিসিস্টিক ওভারি ডিজিজ। এর উপসর্গ হলো মুখে, পেটে, বুকে অবাঞ্ছিত লোম, সঙ্গে ব্রণ ও অনিয়মিত মাসিক। প্রজননক্ষম বয়সে এদের গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল দেখা দেয়।


 

  • থাইরয়েড হরমোনজনিত রোগ পুরুষের তুলনায় নারীর ১০ গুণ বেশি হয়। এই হরমোনের মাত্রা রক্তে কমে গেলে তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলে। হাইপোথাইরয়েডে ওজন বৃদ্ধি, দুর্বলতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, চুল পড়া, শুষ্ক ত্বক, স্মরণশক্তি ও বুদ্ধি কমে যাওয়া, পা ফোলা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। আর শরীরে থাইরয়েড হরমোন বৃদ্ধির কারণে বুক ধড়ফড়, অস্থিরতা, ওজন হ্রাস, ডায়রিয়া ও চোখ বের হয়ে আসার মতো অবস্থা হয়। থাইরয়েডের এই দুই ধরনের সমস্যাতেই অনিয়মিত মাসিক ও পরে গর্ভধারণে সমস্যা দেখা যায়।

  • হাইপার প্রোল্যাকটিনেমিয়া আরেকটি হরমোনজনিত রোগ, যেখানে প্রোল্যাকটিন হরমোন বেড়ে যায়। মস্তিষ্কে পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার বা বিশেষ কিছু ওষুধের জন্য এ সমস্যা হয়। এর উপসর্গ হলো বিবাহিত বা অবিবাহিত মেয়েদের স্তন থেকে দুধ নিঃসৃত হওয়া, মাসিক বন্ধ বা অনিয়মিত হওয়া এবং পরে গর্ভধারণে সমস্যা হওয়া।


     

  • কুশিং সিনড্রোম নামের হরমোনের অসুখে রোগী মুটিয়ে যায়, চামড়া পাতলা হয়ে যায়, ফাটা দাগ হয়, মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পড়ে ও হাড় ক্ষয় দেখা দেয়। শরীরে কোনো টিউমার বা কোনো অসুখের কারণে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অনেক দিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খেলে এই রোগ হয়।

  • মেনোপোজও একটি হরমোনজনিত সমস্যা। এতে প্রাকৃতিকভাবে ঋতুস্রাব সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং নারীরা আর গর্ভধারণে সক্ষম থাকেন না। মেনোপোজ সাধারণত ৪৯ থেকে ৫২ বছর বয়সে হয়ে থাকে। এ সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের ঘাটতির কারণে নারীরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন। সব নারীর ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ সমানভাবে প্রকাশ পায় না। একধরনের গরম ভাব বা দেহে উষ্ণতা অনুভব হয়, যা মুখমণ্ডলের দিকে ছড়িয়ে যায়। এটি হট ফ্লাশ নামে পরিচিত। এর সঙ্গে কাঁপুনি, অতিরিক্ত ঘাম, অস্থিরতা, ত্বক লালচে হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ থাকতে পারে। এ সময় যোনিপথের শুষ্কতা, যৌনমিলনে ব্যথা অনুভব করা, প্রস্রাব আটকে রাখার অক্ষমতা, ওজন বৃদ্ধি, স্তনের আকার বৃদ্ধি ও ব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা, মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড়, নিদ্রাহীনতাসহ নানা রকম মানসিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়।

  • তবে সব ধরনের হরমোনের সমস্যার আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে। সঠিক সময়ে হরমোন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করলে নারীর হরমোনজনিত জটিলতাগুলো এড়ানো সম্ভব।

 

 সূত্র: ডা. রেজওয়ানা সোবহান, সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

Monday, March 6, 2023

কড়া পড়ে কেন


 


দীর্ঘদিন ধরে কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় ঘষা লাগা, প্রেশার বা চাপ লাগা, বাহ্যিক কোনো বস্তুর শরীরে প্রবেশের (যেমন ইনজেকশন) কারণে আমাদের ত্বকে ইনজুরি হয়। এ ধরনের মেকানিক্যাল ইনজুরির কারণে আমাদের ত্বকের বিভিন্ন জায়গায় কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। তার মধ্যে রয়েছে কড়া বা কর্ন, কেলাস ইত্যাদি।

আমাদের পায়ের তালুতে শক্ত, পুরু চামড়ার আবরণ দেখা যায়, একে বলে কর্ন বা কড়া। সাধারণত দেখতে গোলাকার এবং আকারে ছোট হয়ে থাকে। আকৃতিগতভাবে কনিকেল বা শঙ্কুর মতো হয়ে থাকে, যার অ্যাপেক্স বা তির্যক অংশ চামড়ার ভেতরের দিকে থাকে। তাই ভেতরের দিকে চাপ দিলে ব্যথা বোধ হয়। বিশেষ করে হাঁটাচলা করতে গেলে ব্যথা লাগে বেশি। কড়া খুব অস্বস্তিকর এবং যন্ত্রণাদায়ক। তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। নিয়ম মেনে চললে এবং সঠিক চিকিৎসা নিলে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। 

কড়ার মতো আরেকটা শক্ত আবরণ চামড়ায় দেখা যায়, যাকে আমরা কেলাস বলি। কেলাস হাত–পায়ের তালু ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হয়ে থাকে। বিভিন্ন পেশা, দৈনন্দিন কাজ, ব্যায়াম ইত্যাদির সঙ্গে কেলাসের সম্পর্ক রয়েছে। কেলাসের চামড়ার ভেতরের গভীরতা কম বলে সাধারণত ব্যথাহীন হয়ে থাকে।

যদি ওই নির্দিষ্ট কারণ থেকে নিজেকে অব্যাহতি দেওয়া যায়, তাহলে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে কেলাস ভালো হয়ে যায়।


 

প্রকারভেদ

কড়া সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে।

শক্ত কড়া: পায়ের তালুর যেকোনো জায়গায় হয়ে থাকে।

নরম কড়া: পায়ের আঙুলের মধ্যে হয়ে থাকে।

 

কারণ

এক জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে ঘষা লাগা বা ঘর্ষণই মূল কারণ। তা ছাড়া শক্ত বা আঁটসাঁট জুতার কারণেও কড়া পড়ে থাকে।

উপসর্গ

  • পায়ের পাতায় বা পায়ের আঙুলের মধ্যে হয়ে থাকে।

  • উঁচু এবং শক্ত হয়ে থাকে।

  • চামড়া খসখসে, রুক্ষ মনে হবে।

  • ব্যথা বা যন্ত্রণাদায়ক বিশেষ করে হাঁটাচলা করার সময় বা একে ধরে ভেতরের দিকে চাপ দলে।

চিকিৎসা

  • ওয়েল ফিটেড সঠিক ও নির্দিষ্ট মাপের জুতা পরা। জুতা পরিবর্তন।

  • কুসুম গরম পানিতে পায়ের পাতা ভিজিয়ে স্ক্যালপেল ব্লেড বা ঝামাপাথর দিয়ে ছেঁচে ফেলা।

  • এ রোগের চিকিৎসায় স্যালিসাইলিক অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তা ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন সার্জারি এবং লেজার।

     

    সূত্র:  চর্ম ও যৌনরোগবিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

প্রি-ডায়াবেটিসে কী খাবেন


 


রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কিন্তু ডায়াবেটিসের নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম থাকলে তাকে প্রি-ডায়াবেটিস বা বর্ডার লাইন ডায়াবেটিস বলে। ৮৪ শতাংশের বেশি মানুষ জানেন না যে তাঁরা প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। শুধু ১১ শতাংশ মানুষ প্রি-ডায়াবেটিস নিয়ে সচেতন। প্রি-ডায়াবেটিস পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

প্রি-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি 


 

কারও শরীরের বিএমআই (বডি মাস ইনডেক্স) ২৫–এর বেশি হলে, নারীদের কোমরের মাপ ৩৫ ইঞ্চি থেকে ও পুরুষদের ৪০ ইঞ্চি থেকে বেশি হলে প্রি-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। বংশে বিশেষ করে মা-বাবা, ভাই-বোনের ডায়াবেটিস থাকলে এবং ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম না করলে এই ঝুঁকি বাড়ে।

অতিমাত্রায় ফাস্ট ফুড খাওয়া বা কোমল পানীয় পানে এই ঝুঁকি বাড়ে। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি, হৃদ্‌রোগ, থাইরয়েডের সমস্যা ও পিসিওএস, ধূমপানের অভ্যাস থাকলে প্রি-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।

প্রতিরোধে পুষ্টি 


 

প্রি-ডায়াবেটিসের জন্য জীবনযাত্রার পরিবর্তনই একমাত্র চিকিৎসা। অর্থাৎ এর জন্য সাধারণত ওষুধ লাগে না। এ ক্ষেত্রে প্রথমত সতর্ক থাকতে হবে এবং সেই সঙ্গে নিয়ম মানতে হবে। শর্করাবহুল খাবার যেমন সাদা ভাত, সাদা রুটি, মিষ্টি ফল হিসাব করে খেতে হবে।

আঁশবহুল খাবার যেমন ডাল, শাকসবজি, টক ফল ইত্যাদি বেশি খেতে হবে। স্যাচুরেটেড ফ্যাট যেমন ঘি, মাখন, ডালডা কম খেতে হবে। এসবের পরিবর্তে সয়াবিন তেল, ক্যানোলা তেল, সূর্যমুখীর তেল ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। বেশি করে মাছ খাওয়া দরকার। মুরগির চামড়াবিহীন মাংস খাওয়া ও লাল মাংস কম খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।

ডিম সেদ্ধ ও দুধ পরিমাণমতো খাওয়া জরুরি। একই সঙ্গে চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার বাদ দেওয়া এবং ভিটামিন সি–জাতীয় ফল খাওয়া উচিত। সব ধরনের শাক, কম ক্যালরি ও কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার যেমন লাউ, পেঁপে, চিচিঙ্গা, ঝিঙে ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। রান্নায় খুব বেশি লবণ বা পাতে লবণ খাওয়া উচিত নয়।

সপ্তাহে ৫ দিন ৩০ মিনিট করে দ্রুত হাঁটুন। একসঙ্গে ৩০ মিনিট না পারলে ১০ মিনিট করে দিনে ৩ বার হাঁটুন। ওজন ঠিক রাখা প্রি-ডায়াবেটিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধূমপান ও তামাক সেবন বন্ধ করতে হবে।

প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম ও শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। ঘুমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

 

সূত্র: লিনা আখতার, পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর

 

 

ঘাড়ে ব্যথা? নিজেই করুন প্রতিকার


 


ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা খুবই সাধারণ ঘটনা। এই ডিজিটাল যুগে ঘাড়ব্যথার রোগী অনেক বেড়েছে। এক সপ্তাহের বেশি ঘাড়ে ব্যথা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।


 

কেন হয় ঘাড়ব্যথা

  • বয়স হলে ঘাড়ের টিস্যু ক্ষয় হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে ল্যাপটপের সামনে বসে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের এ সমস্যা বেশি হয়। এর কারণে ঘাড়ের মধ্যকার হাড়ে ফাঁক থেকে যায়। যাঁদের সারভাইকাল স্পন্ডেলাইটিস (ঘাড়ে মেরুদণ্ডের অংশে হাড়ক্ষয়) রয়েছে, তাঁদেরও ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে।

  • কোনো কারণে স্পাইনাল কর্ডের কোনো টিস্যু ফুলে গেলে স্লিপ ডিস্ক হতে পারে। সেখান থেকেও ঘাড়ে ব্যথা হয়।

  • কোনো দুর্ঘটনায় ঘাড়ে আঘাত পেলে সেই ব্যথা বহুদিন স্থায়ী হয়। পেশিতে টান লাগলে মাঝেমধ্যেই তখন ব্যথা বাড়ে।

  • বসার ভঙ্গিতে ত্রুটি থাকলে ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে। বাঁকাভাবে শুয়ে থাকলে ঘাড়ে চাপ পড়ে, সেখান থেকেও ঘাড়ব্যথা হতে পারে। এ ধরনের সমস্যা হলে অন্যদিকে ঘাড় ঘোরানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

  • মানসিক অবসাদ ও দুশ্চিন্তা থেকেও ঘাড়ের ব্যথা হতে পারে।

  • অনেক সময় বিছানায় শুয়ে বই পড়া, টিভি দেখা বা উপুড় হয়ে ল্যাপটপে কাজ করা থেকেও ঘাড়ের পেশিতে টান লেগে ব্যথা হয়।

    কারা ঝুঁকিতে


     

    বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর থেকে স্পন্ডাইলোসিসের পরিবর্তন শুরু হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর আগেও হাড়ের ক্ষয় শুরু হয়ে যায়। সামনে ঘাড় ঝুঁকিয়ে কাজ করতে হয়, এমন সব পেশার মানুষদের এ রোগ বেশি দেখা যায়। শুধু চেয়ার–টেবিলে বসে কাজ করেন, যেমন ব্যাংকার, নির্বাহী; কম্পিউটারে একনাগাড়ে কাজ, ঘাড়ে ঝাঁকুনি লাগে, এমন পেশা, যেমন মোটরসাইকেল বা সাইকেলচালকদেরও এ রোগ হতে পারে।

    লক্ষণ



     

    ঘাড়ের ব্যথা অনেক সময় কাঁধ থেকে ওপরের পিঠ, বুক, মাথার পেছনে বা বাহু হয়ে হাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ঘাড় থেকে হাতে নেমে আসা স্নায়ু বা নার্ভের ওপর চাপ পড়লে পুরো হাতেই ব্যথা হতে পারে। সার্ভিক্যাল স্পন্ডোলাইসিসের সমস্যা সবচেয়ে গুরুতর হয়ে দেখা দেয় যখন স্পাইনাল কর্ডের ওপর চাপ পড়ে। হাত–পায়ে দুর্বলতা, হাঁটতে অসুবিধা হতে পারে। পায়খানা-প্রস্রাব বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থাও হতে পারে। ঘাড় নাড়াতে গেলে ব্যথা লাগে। ডানে–বাঁয়ে ঘাড় ঘোরাতে সমস্যা হয়। ঘাড়ে জ্যাম ধরে থাকে।

    ব্যথার সঙ্গে হাতে, বাহুতে হতে পারে ঝিনঝিন, শিরশির, অবশ ভাব, সুচ ফোটানোর অনুভূতি। সেই সঙ্গে হাত দিয়ে কোনো কাজ করতে অসুবিধা হয়।

    পেশিতে টান পড়ার কারণেও ঘাড়ে ব্যথা হয়। স্নায়ু সংকোচন, অর্থাৎ ঘাড়ের ভার্টিব্রায় হার্নিয়েটেড ডিস্ক বা হাড়ের উৎস মেরুদণ্ডের কর্ড থেকে বেরিয়ে আসা স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ার কারণেও ব্যথা হয়। বিভিন্ন সময় আঘাতের কারণে এমনটা হতে পারে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, মেনিনজাইটিস বা ক্যানসারের মতো কয়েকটি রোগেও হতে পারে ঘাড়ব্যথা।

     

    ট্র্যাকশন: দীর্ঘস্থায়ী ঘাড়ব্যথা দূর করতে ওজন, পালি বা একটি বায়ু ব্লাডার ব্যবহার করে ট্র্যাকশন দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। ঘাড়ে ব্যথা, বিশেষত নার্ভ রুট জ্বালা–সম্পর্কিত ব্যথা থেকে মুক্তি দিতে পারে এই চিকিৎসা। মূলত অর্থোপেডিকস চিকিৎসকের পরামর্শে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট এটা দিয়ে থাকেন।

    সার্ভিক্যাল কলার: ঘাড়কে সাপোর্ট দিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এমন একটি নরম কলার পরে থাকতে পারেন। এটা ঘাড়ের কাঠামোগত চাপ বন্ধ করে ব্যথা কমাতে সাহায্য করবে। তবে জেনে রাখা ভালো, একবারে তিন ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করা ঠিক নয়। এক থেকে দুই সপ্তাহের বেশি সময় কলার ব্যবহার করা উচিত হবে না। অতিরিক্ত ব্যবহারে ব্যথা ভালো হওয়ার চেয়ে ক্ষতি হতে পারে।

    ঘরোয়া প্রতিকার


     

    • ব্যথার স্থানে আইসব্যাগ ব্যবহার করা যায়। একটি আইস প্যাক বা বরফে তোয়ালে জড়িয়ে দিনে কয়েকবার দিতে হবে। হালকা গরম পানিতে গোসল করতে পারেন। লো সেটিংয়ে কোনো হিটিং প্যাড ব্যবহার করা যায়। তারপর ঘাড় আলতো করে কাত করুন, বাঁকান এবং ঘোরান।

    • সাধারণ ঘাড়ব্যথা ম্যাসাজেও নিরাময় হয়। তবে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিকে দিয়ে করাতে হবে।

    • আপেল ভিনেগারের অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য ঘাড়ের পেশির স্ট্রেস হ্রাস করে এবং ব্যথা উপশম করে। একটি টিস্যু পেপার আপেল সিডার ভিনেগারে ভিজিয়ে নিন। টিস্যুটিকে আধা ঘণ্টা ঘাড়ের ওপর রেখে দিন। যত দিন না ব্যথা কমছে, দিনে দুবার করে করতে থাকুন।

  • ঘাড়ব্যথা কমাতে এই আসনগুলো অভ্যাস করতে পারেন—

          ভরদ্বাজাসন: ঘাড় ও কাঁধব্যথা উপশমে খুব কার্যকর যোগাসন।

          বালাসন: আসনটি আপনার ঘাড় এবং পেছন প্রসারিত করবে।

          শবাসন: নিয়মিত এ আসন করলে ঘাড়ব্যথা থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

  • ব্যথানাশক লোকাল স্প্রে, জেল দিয়ে ভালোভাবে মালিশ করলে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয়। আবার হালকা গরম পানিতে গোসল করে তারপর জলপাই বা নারকেল তেল হালকা গরম করে কিছুক্ষণ মালিশ করতে পারেন। সকাল ও বিকেল—দুই বেলা মালিশ করলে আরাম পাবেন। মালিশের মাধ্যমেও ঘাড়ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে সঠিক ও অভিজ্ঞ হাতে মালিশ করাতে হবে। তবে এটা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়। 

    তথ্য সূত্র: প্রথম আলো